Wednesday, December 3, 2008

জাজিরা থেকে সেন্ট মার্টিন্স (৩)

দূরন্ত ০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০০৮ সকাল ৯:০৮


সেন্ট মার্টিন্সের প্রাচীন নাম ছিল জাজিরা। স্থানীয় লোকদের মতে আরব বণিকেরা দিয়েছিল এই নাম। পরবর্তীকালে জাজিরা স্থানীয় লোকদের মাধ্যমে নারিকেল জিনজিরা বলে খ্যাত হয়ে ওঠে। কিন্তু পরবর্তীকালে ইংরেজরা একে সেন্ট মার্টিন্স বানায় বলে জানা যায়।
বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপের অধিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশের এবং আরাকানের সংস্কৃতির মিল দেখা যায়। দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির মিলন হলেও দ্বীপবাসী অত্যন্ত রক্ষণশীল। দ্বীপটির উত্তর দিকের লোকজনের মধ্যে রক্ষণশীলতার বেশি এবং দক্ষিণ দিকে কম।
১৯৮০-এর দিকে দ্বীপের জনসংখ্যা হয় প্রায় ৩০০০ জন। বর্তমানে দ্বীপের জনসংখ্যা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৬ হাজার।
সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপটি বহু পুরনো। কিন্তু কৃষিকাজ করার জন্য উপযুক্ত জমির অভাবে এবং বন-জঙ্গলে পূর্ণ থাকার কারণে এখানে বহুকাল জনবসতি গড়ে ওঠেনি।
১৮৯০ থেকে ১৯০০ খৃস্টাব্দে ১৩টি পরিবারের প্রায় ৫০-৬০ জন এ দ্বীপে আসে ও দ্বীপে বাড়িঘর করে বসবাস শুরু করে। সেই সময় দ্বীপের প্রধান বাণিজ্য মিয়ানমারের সঙ্গেই ছিল। প্রধান রফতানি পণ্য ছিল নারিকেল, পেয়াজ, শুটকি মাছ, শৈবাল, কচ্ছপের ডিম। আর ধান-চাল ছিল প্রধান আমদানি পণ্য। পরবর্তীকালে দ্বীপের জনসংখ্যা বাড়তে থাকে।
৭০ দশকের দিক থেকে দ্বীপের অধিবাসীদের মধ্যে সামাজিক পরিবর্তন আসতে থাকে। এ সময় থেকে দ্বীপে মিয়ানমারের তুলনায় বাংলাদেশের প্রভাব বাড়তে থাকে। বর্তমানে মিয়ানমারের প্রভাব অনেক কমে গেলেও পোশাক, আচার-আচরণ ও ভাষায় এর প্রভাব রয়ে গেছে।
তৎকালীন পাকিস্তান আমলে ৬০ এর দশকের শেষদিকে পর্যন্ত এই দ্বীপে মিয়ানমার থেকে প্রচুর চাল বোঝাই নৌকা আসতো এবং তা সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপের মাধ্যমে বাংলাদেশের বদরমোকামে চলে যেতো। ১৯৫৮-এরপর সামরিক শাসনামলে এই ব্যবসা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দ্বীপবাসী কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করে। এ সময় বাণিজ্যিকভাবে মাছ ধরা শুরু হয়। নাইলনের জাল এবং ট্রলারের সংখ্যা বাড়ার ফলে বর্তমানে দ্বীপের মাছ ধরা অনেক বেড়েছে।
তথ্যমতে সেন্ট মার্টিন্সের অধিকাংশ লোক মাছ ধরে। এছাড়াও কিছু ব্যবসায়ী এবং কৃষক রয়েছেন। পর্যটন মৌসুমে হোটেল-রেস্তরাসহ পর্যটকদের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতেও প্রচুর লোক কাজ করে। দ্বীপের প্রায় এক হাজারেরও বেশি লোক অস্থায়ীভাবে বাইরে থেকে আসা। সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপে মাছ ধরার উপযোগী প্রচুর নৌকা আছে। প্রতি নৌকায় ৬-৭ জন করে মাছ ধরার জন্য সমুদ্রে যায়। সাধারণত তারা যেসব মাছ ধরে সেগুলো হচ্ছে ফোকা মাছ, শিংকাটা মাছ, ছড়ি মাছ, গোয়াইল্লা মাছ, সুন্দরী মাছ, গগমাছ, রাছুড়িং, কৈর মাছ, লালা মাছ, রূপচাদা, বলমাছ, ফিটকালামাছ, চান্দানা, ফাইস্যা, বালিয়ামাছ, লবস্টার, চ্যাবা মাছ, কালো সাইট্যা, পিটকালা, ইলিশ মাছ ইত্যাদি। সেন্ট মার্টিন্সের প্রচুর মানুষ সাগর থেকে প্রবাল, ঝিনুক, কড়ি প্রভৃতি সংগ্রহ করে পর্যটকদের কাছে বিক্রি করে। বর্তমানে এসব কাজে প্রচুর শিশু দেখা যায়।

স্থানীয়ভাবে পেজালা নামে পরিচিত Sea weeds বা অ্যালগি (Algae) এক ধরণের সামুদ্রিক শৈবাল সেন্ট মার্টিন্সে প্রচুর পাওয়া যায়। এগুলো বিভিন্ন প্রজাতির হয়ে থাকে তবে লাল অ্যালগি (Red Algae) বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে জনপ্রিয়।
অ্যালগির ১৫০টি প্রজাতি মানুষ এবং পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও এটি দিয়ে মূল্যবান ওষুধ, আইসক্রিম এবং শ্যাম্পুর উপাদান ইত্যাদি তৈরি করা হয়।
অ্যালগি অত্যন্ত পুষ্টিকর। এর মধ্যে উচ্চমাত্রার প্রোটিন, খনিজ পদার্থ, ভিটামিন এবং আয়োডিন আছে।
সংগ্রহ করার পর এটি রোদে শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। সেন্ট মার্টিন্সের অ্যালগি বা পেজালা প্রধানত চোরাপথে মায়ানমারে ও থাইল্যান্ডে চলে যায়। দ্বীপের মধ্য-পশ্চিম উপকূলে প্রচুর পেজালা পাওয়া যায়।

সেন্ট মার্টিন্সের প্রায় সব বাড়িতে নারিকেল গাছ আছে। এগুলো থেকে যথেষ্ট আয় হয়। মাছ ধরার জন্য প্রচুর নৌকার প্রয়োজন। দ্বীপবাসী অনেকে নৌকা তৈরি এবং মেরামত করে। দ্বীপটিতে কিছু কৃষি উৎপাদন হয়ে থাকে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় কম বলে জানা যায়। সেন্ট মার্টিন্সের অধিবাসীদের অনেকেই মাছ ধরার পাশাপাশি কৃষিকাজ করে থাকে। এখানে সাধারণত আলু, পেয়াজ, তরমুজ, ধান, টমাটো, মরিচ, বেগুন ইত্যাদি হয়। সেন্ট মার্টিন্সে প্রচুর আবাসিক হোটেল আছে। বড় হোটেলগুলোর মালিক বাইরের লোক হলেও অধিবাসীরা ছোট ছোট হোটেল করে রুম ভাড়া দেয়। পর্যটনের মাসে অনেকে নিজেদের থাকার রুমও ভাড়া দিয়ে অর্থ উপার্জন করে।
সমুদ্র থেকে মাছ ধরার পর সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করার জন্যও প্রচুর লোক কাজ করে। ছোট মাছ পাটিতে বিছিয়ে, পিটকালা মাছ বালুতে বিছিয়ে এবং বড় জাতের মাছ পেট বরাবর ফেড়ে মাচায় শুকানো হয়। এ ছাড়াও দ্বীপবাসী অনেকে মাছ, নারিকেল, পেজালা এবং ঝিনুক ব্যবসা করে। পাইকারি ব্যবসায়ীরা সংগৃহীত তাজা মাছ, শুটকি মাছ, পেজালা এবং নারিকেল দেশের ভেতরে চট্টগ্রাম এবং ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানে পাঠায়।
[ছবি: লেখকের তোলা]

No comments: