Monday, November 17, 2008

সমুদ্র পাড়ের মিউজিক আইডল: গান ফেরি করে যাদের জীবন চলে !!!

মুনীর উদ্দীন শামীম ০৩ রা নভেম্বর, ২০০৮ সকাল ৮:২৮

অনেক দিন আগে দেখা হয়েছিল। ওদের দু'জনের সাথে। আজ নামও মনে নেই। তবে স্মৃতিটা মনে আছে। আর মনে আছে ওদের দু'জনের চেহারা। ওদের সাথে দেখা হয়েছিল কক্সবাজার সমূদ্র সৈকতে। এক বিকেল বেলা। সূর্যটা তখন ডুবুডুবু। সূর্যের রক্তিম আভা সমূদ্রের সারা গায়। সৈকত জুড়ে তখন হাজারো মানুষের ভীড়। অথৈ সমূদ্রে সূর্যের মাখামাখির শেষ দৃশ্য দেখার অপেক্ষা। প্রকৃতির এমন মায়াবী আয়োজনে মন যখন ভীষণ তন্ময়তার মধ্যে লুটোপুটি খেলছিল ঠিক তখন হঠাৎ কানে বেজে উঠে ওদের একজনের কথা। কথা নয়, রীতিমতো আকুতি-স্যার গান শুনবেন!! তাকিয়ে দেখি সামনে দাঁড়িয়ে আছে ১০-১২ বছরের দু'টি শিশু। পরনে শর্টস। গায়ে জামা আছে, না থাকার মতো। মিটমিট করে হাসছে। সে হাসি আকুতি মাখা। ওদের চোখের অদৃশ্য ভাষা বারবার বলছে, আমরা যেন গান শুনি। অবশ্যই গান শুনি। কী গান শোনাবে?, আমার জিজ্ঞাসায় দু'জন সমস্বরে বলে ওঠে, যেকোন গান, মমতাজ, নোলক বাবু (ক্লোজ ওয়ান ওয়ান) সালমা (দ্বিতীয় ক্লোজআপ ওয়ান), ইত্যাদি ইত্যাদি। আগ্রহ নিয়ে আমরাও নড়েচড়ে বসি। বলি শুনবো। ওরা শুরু করে। একটার পর একটা। থামে না। ওদিকে সূর্যও ডুবছে। ডুবছে আমাদের আগ্রহও। ওদের গান শেষ। আমরা কিছু টাকা ওদের হাতে তুলে দেই। খুবই সামান্য। তারপর ফিরে যাই আমার মূল আগ্রহে। ওদের কাছ থেকে কিছু শোনার কিছু জানার চেষ্টা চলে। এটা-ওটা জিজ্ঞেস করি। সাথে ক্যামেরা থাকায় একটি বাড়তি সুবিধে পাওয়া গেল। আমি ওদের ছবি তুলছি। সেটি ওরা উপভোগ করছে। সাথে বলে যাচ্ছে ওদের জীবন-চিত্রের নানা দিক।
ওরা দু'জনই স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। কিন্তু স্কুলে যায় না। বলা যায় যেতে পারে না। প্রায় নিয়মিতভাবে। দারিদ্রের কারণে। বদলে প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই ছুটে আসে সমূদ্র পাড়ে। এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ঘুরে বেড়ায়। সন্ধ্য এমনকি রাত অবধি চলতে থাকে ওদের এ ছুটে চলা। বেড়াতে আসা মানুষদের ওরা গান শোনায়। গান গেয়ে শুধু নিজের নয়, পুরো পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করে। বাবা নেই ওদের দু'জনেরই। মা আছে। কিন্তু তার কোন উপার্জন নেই। ফলে এ অল্প বয়সে পরিবারের সদস্যদের মুখে অনিয়মিত খাবার-পানী তুলে দেয়ার দায়িত্ব পড়েছে ওদরে হাতে। ওদের মতো আরও অনেক শিশু কক্সবাজার সৈকতে আগত মানুষদের গান শোনায়। শুধু জীবিকার জন্য। বেঁচে থাকার তাগিদে।
সেবার কক্সবাজার গিয়েছিলাম দাপ্তরিক কাজে। রাতে অফিসের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। বস-শ্রমিক-কর্মচারী, সবাই মিলে গান-বাজনা করবে। এক রাতের সাম্যবাদী সাংস্কৃতিক আয়োজন আর কি! হঠাৎ মনে হলো ওদের দাওয়াত দেই। ওরা দু'জনই ভাল গান করে, অন্তত আমার কাছে মনে হয়েছে। আলোঝলমল রিসোর্টের ভেতরে গানগাওয়ার আমন্ত্রণ পেয়ে ওদের চোখগুলো বড় বড় হয়ে উঠলো। খুশীতে কেমন যেন আটখানা। রাতে নির্ধরিত সময়ের অনেক আগেই তারা হাজির। প্রতিষ্ঠিত স্থানীয় শিল্পীদের পর ওরা দু'জন স্টেজে ওঠে। দেশাত্ববোধক, ফোক, সিনেমা থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের গান গায়। হারমোনিয়্যাম ও তবলার সাথে। চারিদিক হাততালির খই ফুটতে থাকে। খাবার-দাবার শেষে অফিসের পক্ষ থেকেও সামন্য কিছু সম্মানী ওদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। গান আর সুরে সবাইকে অভিভূত করে দিয়ে ওরা নিজ গন্তব্যে পা বাড়ায়। বাড়ির দিকে। যেখানে ওদের দরিদ্র মা অপেক্ষা করছে। শুধু ওদের জন্য।

ওরা চলে যায়ভ কিন্তু ভাবনাটা থেকে যায়। বারে বারে দোল খায়। ভীষণভাবে। যে বয়সে ওদের হাতে বই থাকার কথা, যে বয়সে ওরা মায়ের কোলে বসে ছড়া আর কবিতা শেখার কথা সে বয়সে ওরা সমুদ্রের পাড়ে গানের ফেরি করে বেড়ায়। শুধু একটু বেঁচে থাকার জন্য। শুধু একটু খাবারের জন্য। অথচ সুযোগ পেলে ওরাও হয়তো হয়ে উঠতে পারতো বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কণ্ঠ শিল্পীদের একজন। শুধু একটি বাসযোগ্য পৃথিবীর অভাবে যারা হারিয়ে যায় চিরতরে!!!

http://www.somewhereinblog.net/blog/Munirshamimblog/28863864

No comments: